শনিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২১, ০৮:০৩ পূর্বাহ্ন

শরতের চোখ জুড়ানো কাশফুলের সৌন্দর্য

রতি কান্ত রায়, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
  • প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ৮ অক্টোবর, ২০২১

ধরলার পলি মাটি দিয়ে তৈরী ফুলবাড়ীর জনপদ মোগলহাটের কাছে পশ্চিমবঙ্গ হতে বাংলাদেশের ফুলবাড়ীতে প্রবেশ করে চিলমারিতে ব্রহ্মপুত্রের কাছে মিসেছে। ধরলা নদী এ অঞ্চলের মানুষের জীবণ ও জীবিকারও উৎস। যুগ যুগ ধরে ধরলার চরের চোখ জোড়ানো সবুজ ধানের ক্ষেত,সবজিক্ষেত,কলাবাগান,ঝাঁউবন,লাটাবন আর শরতের মন হারানো সাদা কাশফুল এনে দিয়েছে শান্তি ও প্রশান্তি।

সুজলা -সুফলা প্রাকৃতিক রুপ বৈচিত্র্যের এ ভূমি হাতছানি দিচ্ছে মনুষকে । মাইলের পর মাইল দূষ্টি নন্দন ভূমির ধানক্ষেত অপরূপ মোহনীয় হয়ে ধরা পড়ে। চরের সারি সারি কলাগাছ,কাশবন,ঝাঁউবন,কাটাবন,মানুষের প্রাণ জুড়ায় না,অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ‍্যও এনে দেয়।

সুজলা-সুফলা ফুলবাড়ী ধরলা নদীর অবদান।প্রাচিনকাল থেকেই এ অঞ্চলের ফসলের কদর ছিল দেশজুড়ে।

উৎপাদিত ধান,পাট,সরিষা,সুপারি,পান,পেঁপে,কুমড়া চলে যেতো সারাদেশে ও বিদেশে। উত্তর অঞ্চলের কিংবদন্তির চাঁদ সওদাগর তাঁর চৌদ্দ ডিঙ্গায় ভরে এ অঞ্চলের কৃষিপণ‍্য ধরলা নদী পথে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিয়ে যেতেন।

বিনিময়ে বিদেশ থেকে নিয়ে আসতেন মূল‍্যবান পাথর ও সোনা রূপার বিভিন্ন অলংকার। চাঁদ সওদাগরের চৌদ্দ ডিংগার স্মৃতিচিহ্ন এখনও এ অঞ্চলের বিভিন্ন জনপদে দেখা যায়। ধরলার বৈরালি, কর্তি, চিলকি,আইড়,বাঘাআইড়, বাইন, বোয়াল,প্রভৃতি মাছের সুনাম সারাদেশে।

কুড়িগ্রামের বিখ‍্যাত ভাওইয়া শিল্পী কছিমউদ্দিন ধরলা নদীর মাছের প্রশংসা করে গেয়েছিলেন,

ধরলা নদীর ফলুয়া কর্তি তেলে ভাজা করেছে জামাই এসেছে শশুর বাড়িতে । ধরলার সুস্বাদু মাছ দিয়ে জামাই আদর হলেও মাছগুলো এখন নদী থেকে বিলুপ্তপ্রায়।

এক সময় ধরলার চরে দাপিয়ে বেড়াত গরু মহিষের পাল। গৃহস্থদের পালে যতবেশি গরু -মহিষ থাকতো তার সামাজিক মর্যাদা তত বেশি হত। মহিষের পিঠে চরে দোতারা বাজিয়ে নিজের জীবণের সুখ-দুঃখ,প্রেম,ভালবাসা,নিয়ে মুখে মুখে ভাওয়াইয়া গান বাধত মহিশালরা।

এসব গানে এ অঞ্চলের মানুষের সুখ – দুঃখ,ভালোবাসা, সরল জীবণযাপন এবং খোলা মনের পরিচয় পাওয়া যায়। ৩০-৪০বছর আগেও নদীর দুপাশের বাঁশঝাড়ে ,বনে ও বাদারে দেখা যেত।

ডাবকি,শল্লী,বক,শালীক,হাড়গিলা,চখা-চখি,কোড়া ইত‍্যাদী পাখি। প্রবিণ দের কাছে শোনা যায়। বিখ‍্যাত গায়ক আব্বাছ উদ্দীন ফুলবাড়ীতে এক অনুষ্টানে গান গাইতে আসার পথে, ধরলা নদীর পাড়ে, রাখাল বালকদের পুঁটি মাছ দিয়ে ফাঁদ পেতে বক পাখি শিকাড়ের দৃশ‍্য দেখে,রাস্তায় গরুর গাড়িতে বসে গান লিখে, সুর করে,রাতের নির্ধারিত অনুষ্টানে গেয়েছিলেন।

ফাঁন্দে পড়িয়া বগা কান্দে—–রে। এ গান আজ দেশের মানুষের মুখে-মুখে ফিরলেও ধরলার বক পাখি আজ বিলুপ্তির পথে।

ধরলার এসব অতিত ঐতিহ‍্য আজ শুধুই স্মৃতি। পানি শুকিয়ে দিনে দিনে নদী মরে যাচ্ছে ।ধরলার বুকে জেগে ওঠেছে অসংখ্য চর।

ফসলের ঢেউখেলানো সবুজ সমাহার আর শরতের কাশফুল। বিশাল পরিস্কার লীল আকাশ,সাদামেঘের নানা রকম ভাষ্কর্য, বাতাসে ঢেউ খেলানো জাদুতে অতুলনীয় হয়ে উঠে ধরলার সেই অতীত রুপ-লাবণ‍্যকে স্বরণ করলেও ধরলা আজ ধংসের পথে।

ফারাক্কা বাধের কারণে নাব‍্যতা হারিয়ে ধরলার বুকে অসংখ‍্য চর পরলেও সেখানে ঝাঁউবন,কাটাবন ও কাশফুল হওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। বিশাল চরে রাখালের বাঁশির সুর আর শোনা যায় না। সারাদিন চলে চরের বুক চিরে কৃষকের খোঁড়া খুড়ি। খাদ‍্যের প্রয়োজন শরতের কাশফুলের সৌন্দর্য্য আর মানুষের মনে দোলা দেয় না। তবুও শরতের এই অবিছেদ্দ সৌন্দর্য‍্য রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদেরই। শুধু খাদ‍্য নয় সৌন্দর্য্য মানুষের মনকে সিগ্ধ এবং আলোকিত করে। ধরলার অবশিষ্ট সৌন্দর্য্যটুকু রক্ষা করার দায়িত্ব মানুষেরই।

Please Share This Post in Your Social Media

এ বিভাগের আরো সংবাদ